১৯০৫ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার ভাগ রোধের লক্ষ্যে রাখি বন্ধন উৎসব চালু করেন। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে স্মরণ করে এ বছর গঙ্গার চরে বসবাসকারী চরবাসীদের হাতে রাখি পরিয়ে দ্বিতীয়বার বঙ্গভঙ্গ রোধের শপথ নিল গঙ্গাভাবন নাগরিক অ্যাকশন প্রতিরোধ কমিটি।
কমিটির পক্ষ থেকে মালদা জেলার কালিয়াচক ২ নম্বর ব্লকের পিয়ারপুর, পরানপুর, পলাশগাছি, শ্রীঘরসহ সমস্ত মৌজার চরবাসীদের হাতে রাখি পরিয়ে উৎসব পালন করা হয়। চরবাসীরা একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে ঝাড়খণ্ড প্রশাসন থেকে মুক্ত হয়ে আবার বাংলার প্রশাসনের আওতায় আসার, বাংলার ভোটাধিকার, রেশন কার্ড ও আধার কার্ড চালুর দাবি জানান।
গত কয়েক বছরে গঙ্গার বিভিন্ন চরে বসবাসকারী প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ ঝাড়খণ্ডের নাগরিক নয়, এপার বাংলার বাসিন্দা হওয়ার দাবি নিয়ে সংগঠিত হয়েছেন। এই দাবিকে স্বীকৃতি দিয়ে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে গঙ্গা চরের সার্ভে ও পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পরেও প্রশাসন সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়নি। ভোট এসেছে, গেছে, আর একটি পঞ্চায়েত নির্বাচন অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
চরবাসীরা বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের ভোটার তালিকায় নাম তুলে নিয়েছেন বাধ্য হয়ে, কারণ বাংলার ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তারা জীবনের নুন্যতম সেবাও পাচ্ছেন না। তাদের জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় অন্ন, বস্ত্র, পানীয় জল, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। একসময় গঙ্গার এপার বাংলায় যে জীবনের অধিকার তাদের ছিল, ভাঙনের ফলে তা এখন আর নেই।
১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে গঙ্গার ভাঙনে গোটা কে বি ঝাউবানা অঞ্চল নদীর গর্ভে চলে যায়। বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে মালদা জেলার বিভিন্ন অংশে চলে যান, কেউ জমি কিনে বসবাস করতে পারেন, অনেকেই পারেননি। গঙ্গার ভাঙনে সৃষ্টি হওয়া নতুন চরে পিয়ারপুর, শ্রীপুর, বানুটোলা, পলাশগাছি, শ্রীঘর, পরানপুর, নিত্যানন্দপুর, জীতনগর, মঙ্গতপুর, রতনলালপুর, হামিদপুর, ইসলামপুর, কাচিযদুপুর, হাকিমাবাদ, আমানত, কেবি ঝাউবানা, জলবায়ু, খাসমাহল, দুয়াদিয়ারা, নারায়ণপুর, দিলালপুর, পঞ্চানন্দপুরসহ মোট ২১ টি চর গড়ে ওঠেছে। এই চরগুলিতে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের বাস। দীর্ঘদিন ধরে তারা এপার বাংলার বাসিন্দা হওয়ার অধিকার দাবি করছেন, কিন্তু নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় ঝাড়খণ্ডের ভোটার তালিকায় নাম নিতে বাধ্য হয়েছেন।
চরবাসীরা প্রশাসনের অবহেলা এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুবিধার প্রতিবাদে রাখির দিনটিকে বেছে নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করে। গঙ্গা ভাঙন আন্দোলনের দুই নেতা ক্ষিদির বক্স জানান, গঙ্গার ভাঙনে মালদা জেলায় দ্বিতীয়বার বঙ্গভঙ্গ ঘটেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ অন্য রাজ্যের বাসিন্দা। প্রশাসন চরাঞ্চলের জমির সার্ভে ও মাপজোখের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা বাস্তবায়ন করেনি। রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক রাখি বন্ধন উৎসবের স্মৃতিতে তারা দ্বিতীয়বার বঙ্গভঙ্গ রোধে শপথ নিয়েছে।
গঙ্গা ভাঙা প্রতিরোধ কমিটির অন্য নেতা তরিকুল ইসলাম বলেন, ১৯০৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বঙ্গভঙ্গ রোধের লক্ষ্যে রাজু উৎসব পালিত হয়েছিল। আজ তারা গঙ্গার চরাঞ্চলে সেই ঐতিহ্যকে বেঁচে রাখতে রাখি পরিয়ে উৎসব পালন করেছেন।
চরবাসীদের দীর্ঘদিনের অধিকার লড়াইয়ের প্রতীক এই রাখি বন্ধন উৎসব নতুন উদ্যম যোগাচ্ছে বাংলার একাত্মতার জন্য, যেখানে প্রশাসনের উদাসীনতার বিরুদ্ধে চরবাসীরা একজোট হয়ে তাদের স্বাভাবিক নাগরিক অধিকারের দাবি জানাচ্ছেন।





