ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের রায়।মানবতা বিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সোমবার তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। একই মামলায় বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও ফাঁসির সাজা শোনানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রাক্তন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় পেয়েছেন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হলেন। তিনটি ধারায় হাসিনাকে দোষী ঘোষণা করা হয়।
দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আদালতের ৪৫৩ পাতার রায়ে বারবার উঠে এসেছে গণহত্যা, ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক দায়িত্বে অবহেলার কথা। রায়ের পর হাসিনা বলেছেন, বিচারের নামে এটি সাজানো প্রহসন। তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইউনূস সরকারের প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড। একই সঙ্গে তিনি আক্রমণ করেছেন ট্রাইব্যুনালকেও নামে আন্তর্জাতিক, কিন্তু কাজে নয়, বলেছেন হাসিনা,যদি সাহস থাকে, আমাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিন । ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঢেউ ঢাকা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্য মুক্তিযুদ্ধের পরিবার সংরক্ষণ পাবে না তো রাজাকারের সন্তানরা পাবে? এই মন্তব্য আগুনে ঘি ঢালে। তার পরেই ফেটে পড়ে ছাত্রবিক্ষোভ। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ গুলি চালায়। মৃত, আহতদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত তীব্র জনরোষের মুখে ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারত পাড়ি দেন।
এর পরই অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আসেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মহম্মদ ইউনূস। তাঁর সরকারই হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করে। পাঁচটি অভিযোগে হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক গোলাম মর্তুজা মজুমদার, মহম্মদ শফিউল আলম মাহমুদ ও মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী সোমবার রায় ঘোষণা করেন। হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধে সরাসরি নির্দেশ জারি ও সহায়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে আদালত জানায়। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই হাসিনা ছাত্র আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ বলে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। তার পরেই ব্যাপক গণহত্যা ঘটে।
১৪০০ জন নিহত, ২৫ হাজার আহত হন। দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই নির্দেশ কার্যকর করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি। আদালতে শোনানো হয় হাসিনার কথোপকথনের অডিও ক্লিপ, যেখানে গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে শোনা যায় তাঁকে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অভিযোগে ব্যক্তিগত হত্যার আদেশের কথা রয়েছে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, ঢাকার চানখাঁরপুলে ছয় প্রতিবাদীকে গুলি করে হত্যা, এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ। এদিন রায় ঘোষণার পর থেকেই উত্তপ্ত বাংলাদেশ। ৩২ নম্বর ধানমন্ডির শেখ মুজিব স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ভাঙার উদ্যোগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। সেনা মোতায়েন করা হয়েছে ঢাকাসহ সাতটি জেলায়। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে, সেনার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বিক্ষোভকারীরা।
রাস্তায় আগুন ধরিয়ে চলছে আন্দোলন। এই রায়ের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে প্রত্যর্পণের আবেদন জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে এটি ভারতের ‘অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব’।এই নিয়ে নয়াদিল্লির মাথা ব্যথার কারণও যথেষ্ট। একদিকে আইনি বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা। ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ’ বা ‘অন্যায্য বিচার’-এর ক্ষেত্রে অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দিল্লি চাইলে সেই ধারাই ব্যবহার করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনা ভারতের বিশ্বস্ত মিত্র ছিলেন। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় তাঁর সরকারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁকে ফেরত পাঠালে ভারতের পূর্ব সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা। বর্তমানে ভারত সরকার নীরব থাকলেও পর্দার আড়ালে চলছে তীব্র কূটনৈতিক আলোচনা। নয়াদিল্লি এখন অপেক্ষায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক সঙ্কট সামলে কোন পথে হাঁটে ঢাকা। আর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভূমিকা এখন এক অনিশ্চিত সমীকরণ।





