বিধানসভা ভোটের দামামা বাজার আগেই বাংলার রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করল কংগ্রেস। এবারের লড়াইয়ে আদিবাসী ও তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের সমর্থনকেই তুরুপের তাস করতে চাইছে বিধান ভবন। স্রেফ সরকারি ভাতার মলাটে যে জনজাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়, সেই ‘ক্ষোভ’কে হাতিয়ার করেই এবার রাজ্যের প্রতিটি বুথে বিশেষ কমিটি গড়ার ডাক দিল প্রদেশ কংগ্রেস। শনিবার বিধান ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে এই বড়সড় সাংগঠনিক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন দলের এসসি সেলের চেয়ারম্যান রাজেন্দ্রপাল গৌতম।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার ২৯৪টি আসনের পাটিগণিত কষতে গিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব দেখছে, রাজ্যের প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোটারই তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের দাবি, জনগণনা হলে এই পরিসংখ্যান আরও বাড়বে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের সমর্থন পেতে তৃণমূল ও বিজেপি উভয় শিবিরের বিরুদ্ধেই সুর চড়িয়েছে হাত শিবির। রাজেন্দ্রপালের কথায়, ‘কংগ্রেস সরকারই আদিবাসী জনজাতির জন্য প্রকৃত কাজ করেছে। এখন বিজেপি ও তৃণমূল দুই সরকারই তাঁদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। নির্বাচনের আগে ভাতার প্রলোভন দেখিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা চলছে।’
সাম্প্রতিক রাজ্য বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বেকারদের জন্য ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের ঘোষণাকে সরাসরি কটাক্ষ করেছে কংগ্রেস। তৃণমূল সরকারের এই দাওয়াইয়ের মোকাবিলায় রাজেন্দ্রপালের সাফ বক্তব্য, ‘কাজের সুযোগ না বাড়িয়ে ভাতা দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না।’ কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরুদ্ধে সমান আক্রমণ শানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, এক লক্ষের বেশি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন দলিত ও আদিবাসী পড়ুয়ারা। তাঁর দাবি, ‘সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে বেসরকারি শিক্ষার প্রসার বাড়ছে। কিন্তু বেসরকারি স্কুলে মাসে ন্যূনতম চার হাজার টাকা খরচ করা জনজাতি পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। অনেক পরিবারের মাসিক আয়ই যেখানে পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে পড়াশোনা চালানো দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।’
এই আর্থিক টানাপোড়েন আর স্কলারশিপের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বহু পড়ুয়া মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়ছে, এমনকি আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কংগ্রেস নেতারা। তাঁদের মতে, জনজাতির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে গেলে চাই নিবিড় আন্দোলন। সেই লক্ষ্যেই বুথ, ব্লক ও বিধানসভা স্তরে আলাদা কমিটি গড়ে আদিবাসীদের সংগঠিত করার কাজ শুরু হচ্ছে ।
শুভঙ্কর সরকার মনে করেন, বাংলায় রবীন্দ্র-নজরুলের ঐতিহ্য থাকলেও বর্তমানে কেবল বিভেদের রাজনীতি চলছে। সংরক্ষণ থাকা সত্ত্বেও প্রান্তিক মানুষের বাস্তব কোনও উন্নতি হয়নি। এই অচলাবস্থা কাটাতে কংগ্রেসই বিকল্প পথের দিশারি হতে পারে বলে তাঁর দাবি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ ২০ বছর কাটিয়ে এবারই প্রথম কোনো জোট ছাড়াই একলা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কংগ্রেস। বাম বা তৃণমূল—কারও হাত না ধরে বুথস্তরের সংগঠনকে মজবুত করাই এখন বিধান ভবনের পাখির চোখ। এখন দেখার, ভাতার বদলে অধিকারের এই ডাক আদিবাসী ভোটব্যাঙ্কে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।





